তিন যুগের অপেক্ষা, একটি সেতুর অভাবে বন্দি সাহেবের চর
মাহফুজ রাজা,স্টাফ রিপোর্টার:
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার সাহেবের চর গ্রাম। চারদিকে সবুজ ফসলের মাঠ, নদীর সৌন্দর্য আর প্রকৃতির অপার মায়া।
কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অবহেলা আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
মাত্র একটি ছোট সেতুর অভাবেই তিন যুগ ধরে দুর্বিষহ জীবন পার করছে পুরো গ্রামের মানুষ।
এই পথ দিয়েই যেতে হয় কৃষকের মাঠে।
এই পথ দিয়েই স্কুল-কলেজে যায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
কিন্তু রাস্তা নেই, সেতু নেই—
আছে শুধু বুকসমান পানি আর জীবনের ঝুঁকি।
ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা খালটি পুনঃখননের পর বছরের বেশিরভাগ সময় পানিতে ডুবে থাকে চলাচলের পথ।
ফলে প্রায় ৫০০ একর আবাদি জমিতে যেতে প্রতিদিন চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় কৃষকদের।
কাঁধে লাঙ্গল, হাতে ফসল, সঙ্গে গরু-ছাগল নিয়ে পানির মধ্য দিয়ে পার হতে গিয়ে যেন প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয় তাদের।
কখনো কাদায় পড়ে নষ্ট হয় ফসল, কখনো পানিতে পড়ে আহত হয় মানুষ।
কেউ দেখার নেই,
কেউ শোনার নেই।
শুধু কৃষকরাই নয়—স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ যেন আরও হৃদয়বিদারক।
জামা-কাপড় ভিজিয়ে, বইখাতা মাথায় তুলে প্রতিদিন পার হতে হয় এই খাল।
অনেক সময় ভিজে বই নষ্ট হয়, আবার অনেকেই কষ্টে স্কুলে যেতেই চায় না।
স্বপ্নগুলো যেন পানির স্রোতেই হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় গ্রামবাসী জয়নাল (৬৫) বলেন,
“আমরা ছোটবেলা থেইকা এই কষ্ট দেইখা আসতেছি। কত চেয়ারম্যান-মেম্বার আইছে, সেতুর কথা কইছে, কিন্তু আজও কিছুই হইলো না। বর্ষা আইলেই আমরা বন্দি হইয়া যাই।”
আরেক গ্রামবাসী শফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন,
“আমাগো কৃষিপণ্য মাঠ থেইকা আনতেই অনেক কষ্ট হয়। অনেক সময় পানিতে পড়ে ফসল নষ্ট হয়। বাচ্চারা স্কুলে যাইতে ভয় পায়। একটা ছোট সেতুর জন্য কত বছর অপেক্ষা করুম?”
এলাকাবাসী জানান,
নির্বাচন এলে জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসের শেষ থাকে না। কেউ বলেন সেতু হবে, কেউ বলেন কাজ শুরু হবে খুব দ্রুত।
কিন্তু ভোট শেষ হলে প্রতিশ্রুতিও শেষ হয়ে যায়।
বহুবার পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় উঠে এসেছে সাহেবের চরের মানুষের এই সীমাহীন দুর্ভোগের চিত্র।
সংবাদ হয়েছে, প্রতিবেদন হয়েছে, ক্যামেরায় ধরা পড়েছে মানুষের কান্না আর কষ্টের গল্প।
তবুও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্টদের।
আজও একটি ছোট সেতুর অপেক্ষায় দিন গুনছে পুরো গ্রাম।
আজও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যুঝুঁকির বাঁশের সাঁকো, যেখানে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
ভয় আর আতঙ্ক নিয়েই চলাচল করছে হাজারো মানুষ।
গ্রামবাসীর প্রশ্ন—
স্বাধীনতার এত বছর পরও কি একটি ছোট সেতু পাওয়ার অধিকার নেই তাদের?
কত কষ্ট, কত কান্না, কত দুর্ভোগ দেখলে জাগবে দায়িত্বশীলদের বিবেক?
সাহেবের চরবাসীর একটাই দাবি—
দ্রুত একটি সেতু নির্মাণ করা হোক।
যাতে কৃষক বাঁচে, শিক্ষার্থীরা নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে, আর একটি গ্রামের দীর্ঘদিনের কান্নার অবসান হয়।